ব্যবহৃত গাড়ি কেনার আগে দুর্ঘটনার ইতিহাস যাচাই: প্রতারণা এড়ানোর উপায়
বাংলাদেশে একটি ব্যবহৃত গাড়ি কেনা অনেকের জন্যই একটি বড় বিনিয়োগ এবং স্বপ্নের বাস্তবায়ন। কিন্তু এই স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হতে পারে যদি আপনি না জেনে একটি দুর্ঘটনা কবলিত গাড়ি কিনে ফেলেন। অনেক বিক্রেতা অধিক লাভের আশায় গাড়ির দুর্ঘটনার ইতিহাস গোপন করে যান, যা পরবর্তীতে ক্রেতার জন্য জীবননাশের ঝুঁকি এবং আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই, একজন সচেতন ক্রেতা হিসেবে, আপনার প্রথম দায়িত্ব হলো গাড়ির দুর্ঘটনার ইতিহাস পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা।
কেন গাড়ির দুর্ঘটনার ইতিহাস যাচাই করা জরুরি?
দুর্ঘটনা কবলিত গাড়ি, বিশেষ করে যেগুলোর চেসিস বা ফ্রেমে আঘাত লেগেছে, সেগুলো আর কখনোই আগের মতো পারফর্ম করে না। বাহ্যিকভাবে রঙ বা পার্টস পরিবর্তন করে সাময়িকভাবে ঠিক করা হলেও, এর কাঠামোগত দুর্বলতা থেকেই যায়।
- নিরাপত্তা ঝুঁকি: একটি দুর্ঘটনা কবলিত গাড়ির এয়ারব্যাগ ঠিকমতো কাজ না করতে পারে বা এর মজবুত কাঠামো দুর্বল হয়ে যেতে পারে, যা পরবর্তী যেকোনো ছোট আঘাতেও মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
- আর্থিক ক্ষতি: এই গাড়িগুলো প্রায়শই নানান সমস্যায় ভোগে। ইঞ্জিন, সাসপেনশন বা ইলেকট্রিক্যাল সমস্যা লেগেই থাকে, যা আপনাকে বারবার ওয়ার্কশপে ছোটাবে এবং আপনার রক্ষণাবেক্ষণের খরচ অনেক বাড়িয়ে দেবে।
- মানসিক অশান্তি: একটি ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি রাস্তায় চলার সময় আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি ঘটায় এবং সার্বক্ষণিক মেরামতের চিন্তা আপনাকে মানসিক চাপে রাখে।
গাড়ির দুর্ঘটনার ইতিহাস যাচাইয়ের কার্যকর উপায়
প্রযুক্তির কল্যাণে এবং কিছু সাধারণ কৌশল অবলম্বন করে আপনি সহজেই একটি গাড়ির অতীত সম্পর্কে জানতে পারেন। প্রতারণা এড়াতে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন।
১. অকশন শিট ভেরিফিকেশন (জাপানি রিকন্ডিশন্ড গাড়ির জন্য)
বাংলাদেশের ব্যবহৃত গাড়ির বাজারের একটি বিশাল অংশ জাপানি রিকন্ডিশন্ড গাড়ি। এই গাড়িগুলো জাপানের অকশন হাউজ থেকে গ্রেডিংয়ের মাধ্যমে বিক্রি হয়। এই গ্রেড এবং বিস্তারিত তথ্য একটি ‘অকশন শিটে’ উল্লেখ থাকে।
আপনি গাড়ির চেসিস নম্বর ব্যবহার করে অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সহজেই আসল অকশন শিটটি যাচাই করতে পারেন। এর জন্য নামমাত্র কিছু ফি (সাধারণত ৮০০-১০০০ টাকা) লাগতে পারে, কিন্তু এর মাধ্যমে আপনি গাড়ির আসল অবস্থা, মাইলেজ এবং দুর্ঘটনার কোনো ইতিহাস ছিল কিনা তা জানতে পারবেন। ‘R’ বা ‘RA’ গ্রেডের গাড়িগুলো সাধারণত দুর্ঘটনা কবলিত এবং মেরামত করা হয়ে থাকে।
২. ফিজিক্যাল ইন্সপেকশন বা নিজে পরীক্ষা
কেবল বিক্রেতার কথায় বিশ্বাস না করে নিজের চোখ ও সাধারণ জ্ঞান ব্যবহার করুন। গাড়িটি দিনের আলোতে ভালোভাবে পরীক্ষা করুন।
- পেইন্ট ও রঙ: পুরো গাড়ির রঙ ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করুন। কোনো অংশের রঙ যদি বাকি অংশের চেয়ে একটু বেশি উজ্জ্বল বা ভিন্ন মনে হয়, তবে সম্ভবত সেই অংশটি পরে রঙ করা হয়েছে। দরজার রাবার বিডিং বা প্লাস্টিকের অংশে রঙের ছিটেফোঁটা আছে কিনা দেখুন।
- প্যানেল গ্যাপ: গাড়ির দুটি দরজার মাঝখানের ফাঁক, বনেট এবং বাম্পারের সংযোগস্থলের ফাঁকগুলো সমান আছে কিনা খেয়াল করুন। যদি এই গ্যাপগুলো অসমান বা অস্বাভাবিকভাবে কম-বেশি হয়, তবে এটি দুর্ঘটনার লক্ষণ হতে পারে।
- ঝালাইয়ের দাগ: গাড়ির বনেট খুলে ইঞ্জিন কম্পার্টমেন্টের ভেতরে এবং গাড়ির নিচে চেসিসে কোনো নতুন ঝালাইয়ের চিহ্ন আছে কিনা তা পরীক্ষা করুন। ফ্যাক্টরি ফিটিংয়ের বাইরে যেকোনো ঝালাই সন্দেহের উদ্রেক করে।
- টেস্ট ড্রাইভ: গাড়িটি অবশ্যই কমপক্ষে ৩০ মিনিট টেস্ট ড্রাইভ করুন। চালানোর সময় স্টিয়ারিং একদিকে সরে যাচ্ছে কিনা, অস্বাভাবিক কোনো শব্দ হচ্ছে কিনা, বা সাসপেনশন ঠিকমতো কাজ করছে কিনা তা লক্ষ্য করুন।
৩. বিশ্বস্ত মেকানিকের সাহায্য নিন
আপনি যদি গাড়ি সম্পর্কে খুব ভালো না বোঝেন, তবে একজন অভিজ্ঞ এবং বিশ্বস্ত মেকানিককে সাথে নিয়ে যান। একজন পেশাদার মেকানিক তার অভিজ্ঞতা দিয়ে এমন সব সূক্ষ্ম ত্রুটি ধরতে পারবেন যা আপনার চোখে পড়বে না। এটি আপনার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ একটি বিনিয়োগ।
বিক্রেতার মিথ্যা দাবি কীভাবে শনাক্ত করবেন?
একজন অসাধু বিক্রেতাকে তার কথা এবং আচরণ দেখেই অনেকাংশে চেনা সম্ভব। নিচের বিষয়গুলোতে সতর্ক থাকুন:
- তাড়াহুড়ো করা: যদি বিক্রেতা আপনাকে গাড়ি ভালোভাবে পরীক্ষা করার সুযোগ না দিয়ে বা মেকানিক দেখাতে বাধা দিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে চাপ দেন, তবে এটি একটি সতর্ক সংকেত।
- অসঙ্গত তথ্য: গাড়ির ব্যবহার, মাইলেজ বা মালিকানা নিয়ে যদি বিক্রেতা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রকম তথ্য দেন, তবে তার সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলা স্বাভাবিক।
- মূল প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়া: আপনি যখনই গাড়ির দুর্ঘটনার ইতিহাস বা বডি কন্ডিশন নিয়ে প্রশ্ন করছেন, আর বিক্রেতা বারবার ‘পেপারস আপ-টু-ডেট’ বা ‘ইঞ্জিন ফ্রেশ’ বলে প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাচ্ছেন, তখন সতর্ক হন।
ব্যবহৃত গাড়ি কেনা একটি উত্তেজনাপূর্ণ অভিজ্ঞতা হতে পারে, যদি আপনি সঠিক পথে অগ্রসর হন। গাড়ির বাহ্যিক সৌন্দর্যে আকৃষ্ট না হয়ে এর পেছনের ইতিহাস জানুন। উপরে আলোচিত উপায়গুলো আপনাকে একটি নিরাপদ এবং নির্ভরযোগ্য গাড়ি বেছে নিতে সাহায্য করবে এবং প্রতারকদের থেকে আপনার কষ্টার্জিত অর্থ রক্ষা করবে।