গাড়ির অগ্রিম আয়কর (AIT): নতুন বনাম পুরোনো গাড়ির বৈষম্য ও সমাধান
বাংলাদেশে গাড়ি ব্যবহার করা কেবল শৌখিনতা নয়, এটি এখন অনেকের জন্য প্রয়োজনীয়তা। তবে গাড়ি মালিকানার সাথে যুক্ত হয় নানা ধরনের খরচ, যার মধ্যে অন্যতম হলো গাড়ির অগ্রিম আয়কর (AIT)। প্রতি বছর গাড়ির ফিটনেস নবায়নের সময় এই কর প্রদান করতে হয়। কিন্তু বর্তমান কর কাঠামোটি নতুন এবং পুরোনো সব গাড়ির জন্য একই হওয়ায়, এটি পুরোনো গাড়ির মালিকদের জন্য একটি বড় আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ব্যবস্থার কারণে সৃষ্ট বৈষম্য এবং এর সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে আলোচনা করাই এই আর্টিকেলের উদ্দেশ্য।
অগ্রিম আয়কর (AIT) আসলে কী?
অগ্রিম আয়কর বা AIT হলো আপনার বার্ষিক আয়করের একটি অংশ যা আপনি নির্দিষ্ট কিছু সেবা বা সম্পদ ব্যবহারের জন্য আগেই সরকারকে দিয়ে দেন। গাড়ির মালিকদের ক্ষেত্রে, প্রতি বছর বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (BRTA) থেকে ফিটনেস সার্টিফিকেট নবায়নের সময় এই করটি প্রদান করা বাধ্যতামূলক। পরবর্তীতে, আপনি যখন আপনার বার্ষিক আয়কর রিটার্ন দাখিল করবেন, তখন এই অগ্রিম প্রদত্ত অর্থ আপনার মোট কর থেকে সমন্বয় করা হয়। এটি মূলত সরকারের রাজস্ব সংগ্রহের একটি প্রক্রিয়া।
নতুন বনাম পুরোনো গাড়ির AIT: বৈষম্য কোথায়?
সমস্যার মূল কেন্দ্র এখানেই। বাংলাদেশের বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, গাড়ির ইঞ্জিন সিসি (Cylinder Capacity) বা ক্ষমতার উপর ভিত্তি করে AIT নির্ধারণ করা হয়। এর অর্থ হলো, একই ইঞ্জিন সিসির একটি ২০২৩ বা ২০২৪ মডেলের ব্র্যান্ড নিউ গাড়ির মালিক যে পরিমাণ AIT প্রদান করেন, ২০০০ বা তারও আগের মডেলের একটি পুরোনো গাড়ির মালিককেও ঠিক একই পরিমাণ অর্থ প্রদান করতে হয়।
উদাহরণস্বরূপ, ধরা যাক ১৫০০ সিসির একটি গাড়ির জন্য নির্ধারিত AIT হলো ২৫,০০০ টাকা। একজন ব্যক্তি যিনি এই বছর একটি নতুন ১৫০০ সিসির গাড়ি কিনেছেন, তাকে এই পরিমাণ অর্থ দিতে হবে। আবার, অন্য একজন ব্যক্তি যিনি ১৫-২০ বছর ধরে একটি পুরোনো ১৫০০ সিসির গাড়ি ব্যবহার করছেন, তাকেও একই ২৫,০০০ টাকা AIT হিসেবে দিতে হচ্ছে। এখানেই বৈষম্যটি স্পষ্ট।
- সম্পদের অবমূল্যায়ন (Depreciation): একটি নতুন গাড়ির বাজারমূল্য অনেক বেশি থাকে, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে পুরোনো গাড়ির মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। ২০ বছরের পুরোনো একটি গাড়ির বাজারমূল্য তার নতুন অবস্থার তুলনায় প্রায় ৮০-৯০% কমে যেতে পারে। কিন্তু কর প্রদানের ক্ষেত্রে এই অবমূল্যায়নকে কোনোভাবেই বিবেচনায় আনা হচ্ছে না।
- আর্থিক সক্ষমতা: সাধারণত যারা নতুন মডেলের গাড়ি কেনেন, তাদের আর্থিক সক্ষমতা পুরোনো গাড়ি ব্যবহারকারীদের চেয়ে বেশি বলে ধরে নেওয়া হয়। পুরোনো গাড়ির মালিকদের উপর নতুন গাড়ির সমান করের বোঝা চাপানো অর্থনৈতিকভাবে অযৌক্তিক এবং অন্যায্য।
মালিকদের উপর আর্থিক চাপ ও অন্যান্য প্রভাব
এই বৈষম্যমূলক কর কাঠামোর কারণে পুরোনো গাড়ির মালিকেরা তীব্র আর্থিক চাপের সম্মুখীন হচ্ছেন। অনেকের জন্য, গাড়ির বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ এবং অন্যান্য খরচের পর এই বিশাল অঙ্কের AIT প্রদান করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
এর ফলে বেশ কিছু নেতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে:
- ফিটনেস নবায়নে অনীহা: অতিরিক্ত করের বোঝা এড়াতে অনেক পুরোনো গাড়ির মালিক সময়মতো ফিটনেস নবায়ন করছেন না। এর ফলে রাস্তায় ফিটনেসবিহীন ঝুঁকিপূর্ণ গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে, যা সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বৃদ্ধি করছে।
- গাড়ি ব্যবহারে নিরুৎসাহ: যাদের জন্য গাড়িটি দৈনন্দিন প্রয়োজন, তারাও এই অতিরিক্ত খরচের কারণে গাড়ি ব্যবহারে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। এটি তাদের জীবনযাত্রার মান এবং গতিশীলতার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
কর কাঠামো সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা ও সম্ভাব্য সমাধান
একটি ন্যায্য এবং যৌক্তিক কর ব্যবস্থা যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। গাড়ির অগ্রিম আয়কর ব্যবস্থার সংস্কার এখন সময়ের দাবি। শুধু ইঞ্জিন সিসির উপর নির্ভর না করে আরও কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে এই কাঠামোটিকে আরও ন্যায়সঙ্গত করা যেতে পারে।
সম্ভাব্য সমাধান:
- গাড়ির বয়স ভিত্তিক AIT নির্ধারণ: গাড়ির বয়সকে বিবেচনায় নিয়ে একটি স্তরভিত্তিক (Tiered) AIT কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে। যেমন:
- ০-৫ বছর বয়সী গাড়ি: ১০০% AIT
- ৬-১০ বছর বয়সী গাড়ি: ৭৫% AIT
- ১১-১৫ বছর বয়সী গাড়ি: ৫০% AIT
- ১৬+ বছর বয়সী গাড়ি: ২৫% AIT
- অবচয়িত মূল্যের উপর কর: গাড়ির বর্তমান বাজারমূল্য বা অবচয়িত মূল্যের (Depreciated Value) উপর ভিত্তি করে একটি নির্দিষ্ট হারে AIT নির্ধারণ করা যেতে পারে। এটি সবচেয়ে যৌক্তিক এবং ন্যায্য পদ্ধতি হতে পারে।
- পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা: পুরোনো গাড়ি বেশি পরিবেশ দূষণ করে, তাই তাদের উপর কিছুটা অতিরিক্ত পরিবেশ সারচার্জ (Environment Surcharge) আরোপ করা যেতে পারে, কিন্তু মূল AIT হওয়া উচিত গাড়ির বয়সের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।
শেষ কথা
গাড়ির অগ্রিম আয়কর (AIT) নিঃসন্দেহে সরকারের রাজস্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তবে এই কর ব্যবস্থা অবশ্যই ন্যায্য এবং तर्कসংগত হতে হবে। নতুন ও পুরোনো গাড়ির মধ্যে কোনো পার্থক্য না করে ঢালাওভাবে একই হারে AIT আরোপ করা বৈষম্যমূলক এবং এটি পুরোনো গাড়ির মালিকদের প্রতি এক ধরনের অবিচার। আমরা আশা করি, নীতিনির্ধারকেরা বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবেন এবং একটি বয়স-ভিত্তিক ও ন্যায়সঙ্গত AIT কাঠামো প্রণয়নের মাধ্যমে এই দীর্ঘদিনের বৈষম্যের অবসান ঘটাবেন।