Home Blog Legal & BRTA গাড়ি রিকুইজিশন: ব্যক্তিগত বনাম বাণিজ্যিক গাড়ির আইনি সুরক্ষা
গাড়ি রিকুইজিশন: ব্যক্তিগত বনাম বাণিজ্যিক গাড়ির আইনি সুরক্ষা

গাড়ি রিকুইজিশন: ব্যক্তিগত বনাম বাণিজ্যিক গাড়ির আইনি সুরক্ষা

বাংলাদেশে গাড়ি ব্যবহারের ক্ষেত্রে গাড়ির রিকুইজিশন একটি বহুল আলোচিত এবং উদ্বেগের বিষয়। অনেক গাড়ির মালিক এবং চালক প্রায়ই এই সমস্যার সম্মুখীন হন, কিন্তু সঠিক তথ্য এবং আইনি জ্ঞানের অভাবে তারা অসহায় বোধ করেন। বিশেষ করে ব্যক্তিগত গাড়ি রিকুইজিশন করা যায় কিনা, এই নিয়ে ব্যাপক বিভ্রান্তি রয়েছে। আজকের লেখায় আমরা গাড়ি রিকুইজিশন কী, ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক গাড়ির ক্ষেত্রে এর আইনি সুরক্ষা এবং প্রতিকার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।

গাড়ি রিকুইজিশন কী?

রিকুইজিশন শব্দের অর্থ হলো ‘অধিগ্রহণ’ বা ‘চাহিদা জ্ঞাপন’। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, যেমন পুলিশ, জনস্বার্থে বা জরুরি প্রয়োজনে অস্থায়ীভাবে কোনো গাড়ি ব্যবহারের জন্য অধিগ্রহণ করতে পারে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৬-এর ১০৩এ ধারা অনুযায়ী, পুলিশ কমিশনার জনস্বার্থে যেকোনো গাড়ির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলে লিখিত আদেশের মাধ্যমে সেটি অধিগ্রহণ করতে পারেন। তবে এই অধিগ্রহণ অনির্দিষ্টকালের জন্য নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য করা হয়।

ব্যক্তিগত গাড়ির রিকুইজিশন: আইন কী বলে?

গাড়ির মালিকদের মনে প্রধান প্রশ্ন হল, পুলিশ কি তাদের ব্যক্তিগত গাড়ি রিকুইজিশন করতে পারে? সংক্ষেপে উত্তর হলো – না।

২০১৯ সালের ৩১ জুলাই হাইকোর্টের একটি যুগান্তকারী রায়ে বলা হয়েছে যে, পুলিশ প্রাইভেট বা ব্যক্তিগত গাড়ি রিকুইজিশন করতে পারবে না। আদালত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, শুধুমাত্র বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত গাড়ি, যেমন ট্রাক, বাস, মাইক্রোবাস, এবং ট্যাক্সি (অ্যাপ-ভিত্তিক রাইডশেয়ারিং সহ) রিকুইজিশন করা যাবে। এই রায়ের ফলে ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকরা এখন আইনিভাবে অনেক বেশি সুরক্ষিত। যদি কোনো পুলিশ কর্মকর্তা আপনার ব্যক্তিগত গাড়ি রিকুইজিশন করার চেষ্টা করেন, তবে আপনি তাকে হাইকোর্টের এই রায় সম্পর্কে অবহিত করতে পারেন।

বাণিজ্যিক গাড়ির রিকুইজিশন এবং নিয়মাবলী

আইন অনুযায়ী, পুলিশ শুধুমাত্র বাণিজ্যিক রেজিস্ট্রিকৃত গাড়ি রিকুইজিশন করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে:

  • বাস ও মিনিবাস
  • ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান
  • মাইক্রোবাস
  • ট্যাক্সি ও অ্যাপ-ভিত্তিক রাইডশেয়ারিং গাড়ি

তবে বাণিজ্যিক গাড়ি রিকুইজিশনের ক্ষেত্রেও কিছু নিয়মকানুন রয়েছে। যেমন, গাড়িটি কী কাজে, কত দিনের জন্য নেওয়া হচ্ছে, তা লিখিত আকারে গাড়ির মালিককে জানাতে হবে। প্রতিদিনের ব্যবহারের জন্য গাড়ির চালক ও জ্বালানি খরচ কর্তৃপক্ষ বহন করবে। রিকুইজিশন থাকাকালীন গাড়ির কোনো ক্ষতি হলে তার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধানও রয়েছে।

গাড়ি রিকুইজিশনের শিকার হলে আপনার করণীয়

যদি আপনার বাণিজ্যিক গাড়ি রিকুইজিশন করা হয় অথবা অন্যায়ভাবে ব্যক্তিগত গাড়ি আটকানোর চেষ্টা করা হয়, তবে আপনি কিছু পদক্ষেপ নিতে পারেন।

১. লিখিত আদেশ দাবি করুন: গাড়ি রিকুইজিশনের জন্য পুলিশ কর্মকর্তার কাছ থেকে লিখিত আদেশ বা স্লিপ চেয়ে নিন। সেখানে কোন কর্মকর্তার আদেশে, কী কারণে, এবং কত দিনের জন্য গাড়িটি নেওয়া হচ্ছে তার উল্লেখ থাকবে।

২. পরিচয় নিশ্চিত করুন: যিনি গাড়ি রিকুইজিশন করছেন, তার পরিচয় এবং পদমর্যাদা জেনে নিন। প্রয়োজনে তার পরিচয়পত্রের ছবি তুলে রাখুন।

৩. ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানান: যদি আপনি মনে করেন যে আপনার গাড়িটি অন্যায়ভাবে রিকুইজিশন করা হয়েছে, তাহলে দ্রুত আপনার নিকটস্থ পুলিশ স্টেশন বা ট্রাফিক পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করুন। ডিএমপির ক্ষেত্রে, আপনি পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে অভিযোগ জানাতে পারেন।

৪. আইনি সহায়তা নিন: কোনোভাবেই প্রতিকার না পেলে আপনি একজন আইনজীবীর মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন। হাইকোর্টের নির্দেশনা অমান্য করে ব্যক্তিগত গাড়ি রিকুইজিশন করা হলে, এটি আদালত অবমাননার শামিল হতে পারে।

আইনি ধারা ও সুরক্ষা

গাড়ি রিকুইজিশন সংক্রান্ত প্রধান আইনটি হলো ‘ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৬’। এই আইনের ১০৩এ ধারায় পুলিশকে গাড়ি রিকুইজিশনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে, ২০১৯ সালের হাইকোর্টের রায় এই ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছে এবং ব্যক্তিগত গাড়িকে এর আওতামুক্ত রেখেছে।

পরিশেষে বলা যায়, গাড়ির রিকুইজিশন নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে নিজের আইনি অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি। ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকদের জন্য হাইকোর্টের রায় একটি বড় সুরক্ষা কবচ। আর বাণিজ্যিক গাড়ির মালিকদেরও উচিত রিকুইজিশনের নিয়মকানুন সম্পর্কে জেনে রাখা, যাতে কোনো প্রকার অবিচারের শিকার হতে না হয়।

Add comment

Subscribe

Sign up to receive
the latest news

All you need to know about everything that matters

© 2026 BDCarz.com | SAR EX-BA